কাঁদছে মিরসরাই

মহিউদ্দীন জুয়েল, মিরসরাই থেকে: শোকের নগরী মিরসরাই। কাঁদছে সবাই। ঘরে ঘরে আহাজারি। উড়ছে কালো পতাকা। নিস্তব্ধ পুরো এলাকা। বোবা হয়ে ছেলের ছবির দিকে তাকিয়ে আছেন পিতা। মা কাঁদছেন বিলাপ করে। ভাইবোন প্রিয়জন হারানোর ব্যথা নিয়ে ডুকরে কাঁদছেন। একটু পরপরই মূর্ছা যাচ্ছেন। পাথর হয়ে গেছেন পরিবার-পরিজনের লোকজন। এ চিত্র প্রতিটি পরিবারে।সোমবার মিরসরাই স্টেডিয়ামে ফুটবল খেলা শেষে ট্রাকে চড়ে বাড়ি ফেরার পথে লাশ হয়েছে এখানকার ৪৩ স্কুল ছাত্র। যাদের বয়স ৭ থেকে ১৬ বছর।৪ ইউনিয়নের ৯টি গ্রামেই রয়েছে নিহত শিশু-কিশোরদের তালিকা। স্কুল ফাঁকি দিয়ে, শিক্ষকদের চোখ রাঙানি এড়িয়ে তারা সবাই দলবেঁধে গিয়েছিল ফুটবল খেলায় অংশ নিতে। কেউ গিয়েছিল খেলোয়াড় হয়ে। অনেকে হয়েছিল উপদেষ্টা কিংবা নিছক দর্শক। কিন্তু নিয়তি কেড়ে নিয়েছে তাদের শৈশবের এই উচ্ছলতা। ট্রাক উল্টে যাওয়ায় পানির ডোবা থেকে আর ওপরে উঠতে পারেনি তারা।স্থানীয় লোকজন জানান, নিহত এসব স্কুল ছাত্রের মধ্যে বেশির ভাগই ছিল আবু তোরাব উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র। নিহতদের মধ্যে ৩৫ জন ছাত্রই এই স্কুলের। অপর ছাত্রদের মধ্যে কেউ রয়েছে আবু তোরাব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আবু তোরাব মাদ্রাসা, মায়ানী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নামের কয়েকটি স্কুলের।গতকাল সকালে এসব স্কুলের রোকসানা আক্তার, শাহেদা আক্তার, নাছরিন আক্তার, আনোয়ারা  বেগমসহ বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। সহপাঠীরা নেই- এ কথা জানার পর তাদের বেশির ভাগ শিশুর মনেই ঠাঁই নিয়েছে দুঃখবোধ। কাঁদতে কাঁদতে তাই অনেকে মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে।  আবু তোরাব উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জাফর সাদেক কেঁদে ফেলেন। খানিক চুপ থেকে বলেন, ‘দুর্ঘটনার আগে আমি ছিলাম চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডে। আমার স্কুলের এক শিক্ষক মোবাইল ফোনে বললেন, স্যার একটা অঘটন ঘটে গেছে। তাড়াতাড়ি আসেন। আমাদের স্কুলের অনেক ছেলে মারা গেছে। খবরটা শুনে আচমকা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম। এরপর সন্ধ্যার পর থেকে লাশ গুনতে ব্যস্ত হয়ে যাই!’প্রধান শিক্ষক বলেন, ‘এতগুলো ছেলে একসঙ্গে মারা গেছে। কেউ বিশ্বাস করতে পারবে? গতকাল ঘুমাতে পারিনি। রাতের বেলায় একটু চোখ বুঝতেই কিছু পরিচিত ছাত্র যেন ঘুমের মাঝে ডাকছিল। স্যার আমরা আর যাব না।’আবু তোরাব উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে যখন কথা হচ্ছিল, তখন পাশে বসে নিহত ছাত্রদের তালিকা দেখাচ্ছিলেন আরেক শিক্ষক গোলাম মওলা। তিনি বলেন, ‘গ্রামে গ্রামে শোক চলছে। আমরা তিন দিনের শোক ঘোষণা করেছি। স্কুলের সব ছেলে ঘটনাস্থলে যাচ্ছে। তাদের সহপাঠীদের খুঁজে ফিরছে।’আবু তোরাব বাজার ও বড় তাকিয়া সড়কের মাঝামাঝি দুর্ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায় যে ডোবাতে ডুবে মারা গেছে ছাত্ররা- এর পানি হবে কারও মাথা কিংবা কোমর সমান। ট্রাক উল্টে ছাত্ররা ডুবে গেলে তাদের ওপরে পুরো ট্রাকটি থাকায় তারা আর উঠতে পারেনি।সরজমিন শোকাহত পরিবারের সঙ্গে কথা বলতে  গেলে চারদিক থেকে কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছিল। নিহত ৪৩ শিশু-কিশোরের মধ্যে ১৯ জন ছিল মিরসরাইয়ের মায়ানী ও মঘাদিয়া ইউনিয়নের। এই এলাকার অধিকাংশ ঘরে ঘরে রয়েছে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের একজন করে ছাত্র। সোমবারের ঘটনায় এই এলাকার বেশির ভাগই ছাত্রই ছিল ৫ম থেকে ৮ম শ্রেণীর।মধ্যম মায়ানির তারেক হোসেন। সে পড়তো ৮ম শ্রেণীতে। ঘটনার দিন সে গিয়েছিল খেলার দর্শক হয়ে। এরপর তাকেও মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে। পিতা জয়নাল আবেদিনের মুখে যেন কোন ভাষা নেই। ‘আমি সিএনজি চালাই। নিজে পড়ালেখা করতে পারিনি। তাই ছেলেটারে পড়াশোনা করাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু কোথা থেকে কি যে হয়ে গেলো।’   সাখাওয়াত হোসেন পড়তো ৫ম শ্রেণীতে। তার ডাক নাম ছিল নয়ন। তার পিতা শাহ আলম বর্তমানে দেশের বাইরে। এই ছাত্রের বিষয়ে জানতে গেলে তার মা একটু পরপরই জ্ঞান হারিয়ে ফেলছিলেন। এ সময় তার মামা হারুনুর রশীদ বলেন, ‘ছেলেটা খুব মেধাবী ছিল। যেমন পড়তো, তেমন মুখস্থ থাকতো। তার বাবা বিদেশ যাওয়ার আগে বলে গিয়েছিল তার প্রতি খেয়াল রাখতে। ওনাকে (পিতা) এখনও খবরটা দিতে পারিনি। কিভাবে দেব তাই ভাবছি।’ছেলে হারানোর শোক এমনি করে ভুলতে পারছেন না মায়ানি ও মঘাদিয়া এলাকার মীর হোসেনের পিতা জাহেদুল ইসলাম, আবদুল মান্নানের পিতা সাখাওয়াত হোসেন, রুপম চন্দ্র নাথের পিতা গণেশ চন্দ্র নাথ।   মায়ানী ও মঘাদিয়া এলাকার পর আশপাশের আরও কয়েকটি গ্রামে গেলে দেখা যায় সেখানেও শোকে পরিণত হয়েছে লোকজন। শেখের তালুক, মাস্টারপাড়া, কচুয়া, দরগাহপাড়া, সরকার টোলাসহ বেশ কয়েকটি গ্রামের ঘরে ঘরে কালো পতাকা উড়ছে।আবু তোরাব বাজারের স্থানীয় বাসিন্দা ও ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী রফিকুল্লাহ বলেন, ‘এই শোক পুরো মিরসরাইবাসী সইতে পারবে কি-না তা নিয়ে সংশয় আছে। সহজেই পুত্র হারানোর শোক কেউ ভুলতে পারবেন না।’ তিনি আরও বলেন, ‘এই এলাকার বেশির ভাগ লোক জীবিকার তাগিদে সৌদি আরব, কুয়েত, ওমানসহ বেশ কয়েকটি দেশে আছেন। তাদের সবারই প্রত্যাশা ছেলেদের একটু পড়ালেখা করানো। কিন্তু বেশির ভাগ পরিবারেরই সে আশা কান্নায় রূপ নিয়েছে।’একমাত্র পুত্রকে হারিয়ে নির্বাক আনোয়ারওদিকে আমাদের ফেনী প্রতিনিধি কাজী মুহাম্মদ হোসাইন, মিরসরাই থেকে ফিরে জানান,  একমাত্র পুত্র রাজিব হোসেনকে হারিয়ে নির্বাক পিতা আনোয়ার পাশা।  মা হাসিনা বার বার মূর্ছা যাচ্ছেন। সংজ্ঞা ফিরলেই হাউমাউ করে কেঁদে উঠছেন। বলছেন, রাজীব কই। আয় তোর জন্য খাবার নিয়ে বসে আছি। সান্ত্বনা দেয়ার ভাষা হারিয়ে ফেলেছে প্রতিবেশীরা। গতকাল দুপুর ১২টার দিকে মিরসরাইয়ের পূর্ব মায়ানী গ্রামের চুনিমাঝির বাড়িতে গিয়ে এ দৃশ্য দেখা যায়। আনোয়ার পাশা ও হাসিনা আক্তারের তিন সন্তানে মধ্যে রাজিব হোসেন ছিলেন একমাত্র পুত্র। অটোরিকশা চালক আনোয়ার পাশা অভাবের সংসারে স্বপ্ন দেখতেন ছেলে বড় হলে শিক্ষিত হয়ে চাকরি করে সংসারের অভাব ঘোচাবে। মা হাসিনা স্বপ্ন দেখতেন ছেলে শিক্ষিত হয়ে পরিবারের সম্মান বয়ে আনবে। রাজিব হোসেনের বড় বোন রাজিয়া আক্তারও কাঁদছেন অঝোর ধারায়। জানান, সোমবার সকাল ৯টার দিকে বাবার দেয়া টাকা দিয়ে বাজার থেকে গোস্ত কিনে নিয়ে এসেছিল রাজিব। মাকে বলেছিল খেলা শেষে রান্না করা গোস্ত দিয়ে ভাত খাবে। এসব কথা বলে রাজিব হোসেনের মা, বোন বুক চাপড়ে কাঁদছিল। রাজিব হোসেন স্থানীয় আবু তোরাব উচ্চ বিদ্যালয়ের ৬ষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র ছিল। সোমবারের গাড়িচালকের অসাবধানতাবশতঃ দুর্ঘটনায় অন্যদের মতো চিরদিনের জন্য তার জীবনপ্রদীপ নিভে যায়। মিরসরাইয়ের তিনটি ইউনিয়ন মায়ানী, মগাটিয়া ও কৈয়াছড়ার প্রতিটি পাড়ায় কবর আর শ্মাশন। চলছে ঘরে ঘরে কান্নার রোল। সবার চোখে পানি।

more

http://www.prothom-alo.com/detail/date/2011-07-12/news/169737



Written by: tadmin at 2011-07-13 00:59:38


TS Management System